নীরব ঘাতক সিগারেট: ক্যান্সার, হৃদরোগ ও অকাল মৃত্যুর প্রধান কারণ।
স্বাস্থ্য সতর্কতা: নীরব ঘাতক সিগারেট, ডেকে আনছে অকাল মৃত্যু ও মারাত্মক রোগ
ঢাকা: ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর—এই সতর্কবার্তা সিগারেটের প্যাকেটে লেখা থাকলেও, বিশ্বজুড়ে এর কারণে প্রতি বছর মারা যাচ্ছেন লাখ লাখ মানুষ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিগারেট বা তামাকজাত দ্রব্য মানুষকে বয়সের আগেই মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং এর ফলে শরীরে বাসা বাঁধছে একাধিক দুরারোগ্য ব্যাধি। শুধুমাত্র প্রত্যক্ষ ধূমপায়ীই নন, পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়েও অনেকে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।
সিগারেট বা ধূমপানের কারণে শরীরে যেসব মারাত্মক সমস্যা হতে পারে, তা বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো:
১. ক্যান্সার (Cancer):
* ধূমপানের সবচেয়ে মারাত্মক ফল হলো ক্যান্সার। সিগারেটের ধোঁয়ায় ৪,০০০-এরও বেশি ক্ষতিকারক রাসায়নিক থাকে, যার মধ্যে ৬৯টি হলো কার্সিনোজেন (ক্যান্সার সৃষ্টিকারী)।
* এটি ফুসফুসের ক্যান্সার, মুখগহ্বরের ক্যান্সার, গলার ক্যান্সার, খাদ্যনালীর ক্যান্সার, মূত্রাশয়ের ক্যান্সার, কিডনি এবং অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকি বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়।
২. হৃদরোগ ও স্ট্রোক (Cardiovascular Diseases and Stroke):
* সিগারেটের নিকোটিন রক্তনালীকে সংকুচিত করে এবং রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়, ফলে হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।
* ধূমপানের কারণে রক্তের ধমনীতে চর্বি জাতীয় পদার্থ (প্লেক) জমা হয়, যা রক্তপ্রবাহে বাধা দেয়। এর ফলে করোনারি হার্ট ডিজিজ এবং হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
৩. ফুসফুসের রোগ (Lung Diseases):
* ধূমপান শ্বাসনালী এবং ফুসফুসের ক্ষুদ্র বায়ু থলির (অ্যালভিওলি) ক্ষতি করে।
* এর ফলে ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (COPD), যেমন - এমফাইসিমা (Emphysema) এবং ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিসের (Chronic Bronchitis) মতো শ্বাসযন্ত্রের জটিল রোগ হতে পারে।
* এছাড়া ধূমপায়ীদের যক্ষ্মা (Tuberculosis-TB) এবং ফুসফুসের ইনফেকশনে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেশি।
৪. বন্ধ্যাত্ব ও প্রজনন সমস্যা (Infertility and Reproductive Issues):
* পুরুষ ও মহিলা উভয়ের ক্ষেত্রেই ধূমপান বন্ধ্যাত্বের কারণ হতে পারে।
* ধূমপায়ী পুরুষদের মধ্যে লিঙ্গ উত্থানে অক্ষমতার (Erectile Dysfunction) ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
৫. অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা:
* ডায়াবেটিস: ধূমপান ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
* দৃষ্টিশক্তি হ্রাস: এটি অন্ধত্ব ও চোখের নানা সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
* হাড়ের ক্ষয়: ধূমপানের কারণে হাড়ের ক্ষয় বৃদ্ধি পায়, ফলে বাতের ব্যথায় ভোগার প্রবণতা দেখা দেয়।
* পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা: গ্যাস্ট্রাইটিস, গ্যাস্ট্রিক আলসার, ক্ষুধামন্দা এবং হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
* ওরাল হেলথ: নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ, দাঁত ও মাড়ির রোগ এবং মুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে।
* ত্বক ও চুল: ত্বক ডিহাইড্রেট হয়ে যায়, ফলে ত্বকের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা কমে যায়। চুল পড়ার সমস্যাও দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তামাক ব্যবহার বাদ দিলে অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি বছর সারাবিশ্বে প্রায় ৬০ লাখ লোক তামাকের ক্ষতিকর প্রভাবে মারা যায়।
পরোক্ষ ধূমপানও মারাত্মক:
মনে রাখা জরুরি, একজন অধূমপায়ী ব্যক্তিও ধূমপায়ীর ধোঁয়া শ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন। পরোক্ষ ধূমপান শিশুদের ফুসফুসের সমস্যা ও অন্যান্য রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এটি গর্ভপাত বা নবজাতকের কম ওজন নিয়ে জন্ম হওয়ার কারণ হতে পারে।
স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ধূমপান পরিহার করা এবং অন্যদেরও ধূমপান থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করা অত্যন্ত জরুরি।
