মেট্রোরেল রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে চরম উদ্বেগ: কর্মকর্তারা বলছেন 'বরাদ্দ শূন্য'ঢাকা: ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) মেট্রোরেলের রক্ষণাবেক্ষণ খাতে বর্তমানে কার্যত কোনো আর্থিক বরাদ্দ নেই, যা নিয়ে সংস্থার কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও আক্ষেপ সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া রক্তক্ষয়ী দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এই বিষয়টি আরও প্রকট হয়েছে।কালবেলার সঙ্গে আলাপে ডিএমটিসিএলের অন্তত পাঁচজন বর্তমান ও প্রাক্তন কর্মকর্তা অপ্রতুল রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদের বিভিন্ন মিটিংয়ে বারবার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তার ওপর আলোচনা উঠলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।অবসরপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা জানান, পরিচালনা পর্ষদের শেষ কয়েকটি সভায় রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফারুখ আহামেদ তাতে বিশেষ গুরুত্ব দেননি এবং 'যেভাবে চলছে সেভাবে চলুক' এমন মনোভাব দেখান। আরেক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন, সর্বশেষ পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকেও বিষয়টি উঠলেও, গুরুত্ব না পাওয়ায় সভার কার্যবিবরণীতে তা স্থান পায়নি।গত ২৯ সেপ্টেম্বর ডিএমটিসিএলের ৭১তম পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়, যার সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক। এই সভার আলোচ্যসূচি-২ এ বাজেট সংক্রান্ত আলোচনা ছিল। এর আগে ২৩ জুলাই ৭০তম সভায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ২৭০ কোটি ২২ লাখ ৫৫ হাজার টাকার খসড়া বাজেট প্রস্তুত করা হয়। পরবর্তীতে ৮ সেপ্টেম্বরের অডিট ও ফিন্যান্স কমিটির সভায় তা বিশ্লেষণ করে চলতি অর্থবছরের জন্য ২১৫ কোটি ২২ লাখ চার হাজার টাকার প্রাক্কলন করা হয়, যা ডিসেম্বরে সংশোধনী বাজেটের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। তবে একাধিক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, এই বাজেটের রক্ষণাবেক্ষণ খাতে আর্থিক বরাদ্দ রাখা হয়নি।এমডি’র বক্তব্য ও রক্ষণাবেক্ষণ ঘাটতিরক্ষণাবেক্ষণে বরাদ্দের অভাব নিয়ে কালবেলার প্রশ্নের জবাবে ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুখ আহামেদ বলেন, "বরাদ্দ একেবারে নেই, এই দাবি সঠিক নয়, তবে বরাদ্দ কম। ঠিক কত বরাদ্দ আছে এই মুহূর্তে বলতে পারব না।" তিনি আরও যোগ করেন, বর্তমানে ‘ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড’ চলায় রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টিতে মনোযোগ দিতে হচ্ছে না, বরং মেরামতের কাজ চলছে। এই সময়কাল শেষ হলে আগামী বছর থেকে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দ অন্তত তিনগুণ বৃদ্ধি পাবে।তবে ডিএমটিসিএলের সংশ্লিষ্ট শাখার একাধিক কর্মকর্তা তাদের বক্তব্যেই অটল থেকে জানিয়েছেন, রক্ষণাবেক্ষণ খাতে কোনো আর্থিক বরাদ্দ নেই।
রক্তক্ষয়ী দুর্ঘটনার কারণ:এমডি'র বক্তব্যে রক্ষণাবেক্ষণ অনুপস্থিতরোববারের রক্তক্ষয়ী দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে এমডি ফারুখ আহামেদ চারটি সম্ভাব্য কারণ উল্লেখ করেন: নকশার ত্রুটি, অবকাঠামো নির্মাণে ত্রুটি, নির্মাণসামগ্রীর নিম্নমান এবং নির্মাণকাজের তদারকিতে দুর্বলতা।আশ্চর্যজনকভাবে, তিনি সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবের বিষয়টি উল্লেখ করেননি। এর কারণ জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, "রক্ষণাবেক্ষণ নিয়মিত হচ্ছে, এতে কোনো কমতি নেই।"এদিকে, দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে গঠিত তদন্ত কমিটির এক সদস্য জানান, ফার্মগেট মেট্রো স্টেশন তিনতলা এবং বিজয়সরণি দ্বিতল হওয়ায় এই অংশে স্বাভাবিকভাবেই একটি 'কার্ভ' বা বাঁক রয়েছে, যেখানে দুবার একই ধরনের ঘটনা (বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়া) ঘটল। তিনি আরও বলেন, ২০০ টন ওজনের ভায়াডাক্টের নিচে চাপা থাকা সত্ত্বেও বিয়ারিং প্যাড কীভাবে সরে যায়, তা গভীর গবেষণার বিষয়। তিনি মনে করেন, এটি তিন দিনে না কি তিন মাসে সরেছে, তা পর্যালোচনা করা জরুরি।এর আগে গত বছর ১৮ সেপ্টেম্বর ফার্মগেটে ৪৩০ নম্বর খুঁটি থেকে একটি বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়েছিল। এবার মাত্র তিন খুঁটির ব্যবধানে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো।দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথবাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. শামছুল হক দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ওপর জোর দেন। তিনি পরামর্শ দেন, "ডিএমটিসিএলের অভ্যন্তরে শক্তিশালী ও প্রকৌশলী নেতৃত্বাধীন একটি রক্ষণাবেক্ষণ ইউনিট গঠন করতে হবে, যারা প্রতি ছয় মাস অন্তর দৃশ্যমান পরিদর্শন ও বছরে একবার লোড টেস্ট পরিচালনা করে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা নিতে পারবে।"সার্বিক পরিস্থিতি এবং রোববারের দুর্ঘটনা নিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় দায়িত্বে থাকা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী শেখ মইনউদ্দিন বলেন, "রক্ষণাবেক্ষণ কাজে কোনো বাজেট নেই, তা আমার জানা ছিল না।" তিনি জানান, রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ডিএমটিসিএলের নিজস্ব কোনো দল নেই এবং সেটি তৈরি করা প্রয়োজন, পাশাপাশি বাজেটও বাড়াতে হবে। তিনি আরও বলেন, দেশের সক্ষমতা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত বছরে অন্তত একবার বিদেশ থেকে একটি দল এনে পুরো মেট্রোরেল সাইট পরীক্ষা করানো উচিত।
Tags
দেশজুড়ে
