চিকিৎসা সরঞ্জাম সচল রাখার তদারকি: ২৯ কোটি টাকার নতুন সফটওয়্যার, কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন

  চিকিৎসা সরঞ্জাম সচল রাখার তদারকি: ২৯ কোটি টাকার নতুন সফটওয়্যার, কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন

সোমবার, ২০ অক্টোবর ২০২৫

ঢাকা: দেশের সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণের জন্য ২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি নতুন সফটওয়্যার চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। 'মেডিকেল ইক্যুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ইনফরমেশন অ্যান্ড মনিটরিং সিস্টেম' নামের এই পদ্ধতি স্থাপন নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে, কারণ এর আগেও প্রায় একই ধরনের প্রযুক্তিতে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও সেটি কার্যকর হয়নি।

জানা যায়, এই নতুন প্রযুক্তি স্থাপন করতে গিয়ে পূর্বে বিদেশি অর্থায়নে সংযুক্ত একটি পুরোনো সফটওয়্যারকে অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে। এর আগে ইউএসএআইডি (USAID) এর সহায়তায় তৈরি করা 'অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম' নামের একটি সফটওয়্যার ২০১৫-১৬ অর্থবছর নাগাদ দেশের ৪০টিরও বেশি জেলায় চালু ছিল। এই সিস্টেমে কিউআর কোড ব্যবহার করে যন্ত্রপাতির হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যেত, কিন্তু ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিকেল ইক্যুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার (নিমিউ অ্যান্ড টিসি) তথ্য জানার পরও মেরামতের ক্ষেত্রে সেটিকে গুরুত্ব না দেওয়ায় আগের ব্যয়বহুল উদ্যোগটি ব্যর্থ হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, 'অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম' সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর সফটওয়্যারটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে হস্তান্তর করা হলেও এটির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়নি।

ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে বিতর্ক:

চলতি বছরের ১৮ আগস্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে 'নিমিউ অ্যান্ড টিসি'-কে চিঠি দিয়ে এমআরআই, সিটি স্ক্যান, এক্স-রে, লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর ও কোবাল্ট মেশিনের মতো উচ্চ প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি সার্বক্ষণিক সচল রাখা নিশ্চিত করতে এই নতুন 'মনিটরিং সিস্টেম' স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

প্রথমে নিমিউ অ্যান্ড টিসি এই সফটওয়্যার তৈরি ও স্থাপনের জন্য ভ্যাট ও এআইটি সহ ২০ কোটি ৫৮ লাখ টাকার কিছু বেশি ব্যয় প্রস্তাব করেছিল। তবে পরবর্তীতে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এই ব্যয় বেড়ে ২৯ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।

সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বলছেন, এই ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ ৮ থেকে ১০ কোটি টাকা খরচ যৌক্তিক। তাদের মতে, নিমিউর প্রথম প্রস্তাবিত ২০ কোটি টাকাও বেশি ছিল, যা রহস্যজনকভাবে ২৯ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। তারা মনে করছেন, এই অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশ থাকতে পারে।

সিস্টেমের সীমাবদ্ধতা:

প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থায় ক্লাউড স্টোরেজের মাধ্যমে প্রতিটি হাসপাতালের যন্ত্রপাতি নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকবে, যাতে কোনো যন্ত্র বিকল হলেই একাধিক স্থানে তাৎক্ষণিক নোটিফিকেশন পাঠানো যায় এবং দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

তবে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, এই প্রযুক্তির পূর্ণ সুফল পেতে হলে সব হাসপাতালের যন্ত্রপাতিকে 'কম্প্রিহেনসিভ মেইনটেন্যান্স কন্ট্রাক্ট' (সিএমসি)-এর আওতায় আনতে হবে। বর্তমানে দেশে উচ্চ প্রযুক্তির মাত্র ১৫টি যন্ত্রের মধ্যে ৭টির সিএমসি চুক্তি রয়েছে। ইউরোপের মতো দেশে এই প্রযুক্তি কার্যকর কারণ সেখানে বেশিরভাগ স্বাস্থ্য সরঞ্জাম লাইফটাইম সিএমসি চুক্তির আওতায় থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে ওয়ারেন্টি শেষ হওয়ার পর যন্ত্রের কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়ে, বিশেষত যখন মেরামতের দায়িত্বও নিমিউ অ্যান্ড টিসি-র হাতে থাকে।

কর্মকর্তারা আরও জানান, চলতি ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম ধাপে ১১৪টি সরকারি হাসপাতালের ক্যানসারসহ গুরুতর রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় ব্যবহৃত ৩০০টি যন্ত্র— যার মধ্যে এমআরআই, সিটি স্ক্যান, এক্স-রে ও রেডিওথেরাপির সরঞ্জাম রয়েছে— এই মনিটরিং সিস্টেমের আওতায় আনা হবে।

জনবল সংকট:

বর্তমানে দেশের প্রায় ৭০০ সরকারি হাসপাতালের যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের দায়িত্বে রয়েছে নিমিউ অ্যান্ড টিসি। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, পাঁচ শতাধিক যন্ত্রপাতি মেরামতের আবেদন ঝুলে আছে। চিফ টেকনিক্যাল ম্যানেজার জয়ন্ত কুমার মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ৪১৫টি যন্ত্র মেরামতের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে এবং বাকিগুলোর সমস্যা চিহ্নিতকরণে পরিদর্শন চলছে। তিনি জনবল স্বল্পতাকে বিলম্বের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন, যেখানে ৯৫টি পদের মধ্যে ৫৮টি শূন্য রয়েছে। বর্তমানে ১৯ জন সহকারী প্রকৌশলীসহ মোট ৫৫ জন কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাইদুর রহমান জানান, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় সফটওয়্যারটি এখনো স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। আগের কোনো সফটওয়্যার ছিল কি না, তা তার জানা নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।


নবীনতর পূর্বতন