অব্যবহৃত কক্সবাজার রেলওয়ে স্টেশন: বিশাল বিনিয়োগ সত্ত্বেও অচল, উদ্বেগে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা
সোমবার, ২০ অক্টোবর ২০২৫.
কক্সবাজার: বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত কক্সবাজারের ছয়তলাবিশিষ্ট আধুনিক রেলওয়ে স্টেশনটি উদ্বোধনের পরও কার্যত অচল হয়ে পড়ে আছে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত এই বিশাল অবকাঠামো থেকে প্রত্যাশিত যাত্রীসেবা এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে এর ভবিষ্যৎ পরিচালনা নিয়ে। এমন পরিস্থিতিতে রেলওয়ে স্টেশনটির পরিচালন ভার বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার সম্ভাবনার বিষয়টি সামনে এসেছে।
স্টেশনের চিত্র:
* নিচতলা (৪৬,০৭৩ বর্গফুট): এখানে টিকিট কাউন্টার, সরকারি সেবা, এটিএম বুথ, ডাকঘর, লাগেজ ও লকার ব্যবস্থা, তিনটি দোকান এবং যাত্রী বিশ্রামাগার থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা যায় শুধু কয়েকটি বসার বেঞ্চ।
* দ্বিতীয় তলা (৪২,০৭৭ বর্গফুট): ১৭টি দোকান, ফুড কোর্ট, ডিপারচার ও ওয়েটিং লাউঞ্জ, ট্যুরিস্ট ইনফরমেশন ডেস্ক, প্রোডাক্ট ডিসপ্লে সেন্টার এবং প্রার্থনাকক্ষ থাকলেও সবগুলোই নিষ্ক্রিয়। সরেজমিনে দেখা যায় ওপরের তলাগুলো বন্ধ ও অন্ধকার।
* তৃতীয় তলা (৩৫,৩২৫ বর্গফুট): এখানে ভাড়া দেওয়ার জন্য ১৭টি দোকান, পাঁচটি শোরুম, ফুড কোর্ট ও রেস্টুরেন্ট প্রস্তুত করা আছে।
* চতুর্থ তলা (৪৩,০৬৬ বর্গফুট): এই তলাটি হোটেল সুবিধার জন্য তৈরি করা হয়েছে, যেখানে ২৫টি স্ট্যান্ডার্ড ও ১৪টি ডিলাক্স রুমসহ মোট ৩৯টি কক্ষ রয়েছে। এছাড়া চারটি বাণিজ্যিক স্পেস, রেস্টুরেন্ট ও ডাইনিং এরিয়াও আছে।
* পঞ্চম তলা (৩৫,৭৩৪ বর্গফুট): এখানে সাতটি অফিস স্পেস, একটি মাল্টিপারপাস হল এবং একটি রেস্টুরেন্ট রয়েছে।
* ষষ্ঠ তলা (৩৬,৫৯২ বর্গফুট): এটি সম্পূর্ণভাবে মাল্টিপারপাস ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত।
প্রতিটি ফ্লোরে সিঁড়ি, এসকেলেটর, বেবি কেয়ার কর্নার, টয়লেট ও ইনফরমেশন ডেস্কের মতো আধুনিক সুবিধা রয়েছে। প্রশাসনিক ভবনসহ বাইরে আরও ১৭টি স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। সবমিলিয়ে ২১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই স্টেশন ভবনটির অবকাঠামো বর্তমানে কোনো কাজে আসছে না।
নির্মাণ প্রকল্প:
দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটি শুরু হয় ২০১৮ সালের জুলাইয়ে, যার মোট ব্যয় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। এই মেগা প্রকল্পে কাজ করেছে চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (সিআরইসি), চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি) এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশন ও ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড।
বিশেষজ্ঞের মতামত:
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, সঠিক পরিচালনা ও উদ্যোগের অভাবে শত কোটি টাকা বিনিয়োগের এই বিশাল স্টেশন থেকে কোনো সুফল আসছে না। তিনি এটিকে 'বোঝা' হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, "বিনিয়োগের রিটার্ন না আসায় এমন অবচয় হচ্ছে।" তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, সবকিছুর জন্য বিদেশিদের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়, দেশের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান তৈরি করার ওপরও জোর দেওয়া জরুরি।
