এইচএসসিতে ৪ লাখের বেশি খাতা চ্যালেঞ্জ, পুনর্মূল্যায়নের দাবি



এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে নজিরবিহীন অসন্তোষ, ৪ লাখেরও বেশি খাতা চ্যালেঞ্জ: শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের জোরালো দাবি পুনর্মূল্যায়নের

ঢাকা: চলতি বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার পর সৃষ্ট অসন্তোষের জেরে নজিরবিহীন সংখ্যক উত্তরপত্র চ্যালেঞ্জের আবেদন জমা পড়েছে। এবার মোট ৪ লাখ ২৮ হাজার ৪৫৮টি খাতা পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করেছেন দেশের বিভিন্ন বোর্ডের ১ লাখ ৯৩ হাজার ২৫৮ জন পরীক্ষার্থী। এবারের ফলাফলে ৪১.১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী ফেল করায় (সংখ্যায় যা পাঁচ লক্ষাধিক), এই আবেদনের সংখ্যা এত বেড়েছে। একই সঙ্গে, জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও গত বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।

দাবি: পুনর্নিরীক্ষণ নয়, চাই পুনর্মূল্যায়ন

অসন্তুষ্ট শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা দাবি করছেন, বর্তমান পদ্ধতিতে কেবল 'পুনর্নিরীক্ষণ' নয়, বরং উত্তরপত্রগুলো 'পুনর্মূল্যায়নের' সুযোগ দিতে হবে। তারা যুক্তি দিচ্ছেন, শুধু পুনর্নিরীক্ষণে প্রতি বছর হাজারো ভুল ধরা পড়ছে। পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ থাকলে আরও বেশি ত্রুটি খুঁজে পাওয়া যাবে এবং অনেক যোগ্য শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হবে বলে তাদের দাবি। উদাহরণস্বরূপ, রাজধানীর একজন অভিভাবক জানান, তার সন্তান অন্য সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পেলেও ধর্ম বিষয়ে ৭৯ নম্বর পাওয়ায় সামগ্রিক জিপিএ-৫ হাতছাড়া হয়েছে, তাই খাতা পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি।

তবে শিক্ষা বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যমান পরীক্ষা সংক্রান্ত আইন পরিবর্তন না করা পর্যন্ত উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তারা কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের অনুমোদিত নীতিমালা অনুসারেই কাজ করতে পারেন। তারা আশ্বাস দিয়েছেন, এই দাবিগুলো নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি জানাবেন।

বর্তমান পুনর্নিরীক্ষণে যা দেখা হয়

বর্তমানে চালু থাকা নিয়মানুযায়ী, খাতা চ্যালেঞ্জের আবেদন করা একজন পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্রে চারটি নির্দিষ্ট দিক খতিয়ে দেখা হয়। এগুলো হলো: ১. উত্তরপত্রের সব প্রশ্নের নম্বর সঠিকভাবে যোগ করা হয়েছে কি না; ২. প্রাপ্ত মোট নম্বর গণনা ঠিক আছে কি না; ৩. প্রাপ্ত নম্বর ওএমআর শিটে যথাযথভাবে উঠানো হয়েছে কি না; এবং ৪. প্রাপ্ত নম্বর অনুযায়ী ওএমআর শিটের বৃত্ত সঠিক পদ্ধতিতে ভরাট করা হয়েছে কি না। এই চারটি জায়গায় কোনো ভুলত্রুটি থাকলে তা সংশোধন করে একটি সংশোধিত ফল প্রকাশ করা হয়। সংশোধিত ফল আগামী ১৬ নভেম্বর প্রকাশ করা হবে। ফল পরিবর্তন হওয়া আবেদনকারীরা এসএমএস এবং বোর্ডের ওয়েবসাইটে তাদের নতুন ফল জানতে পারবেন।

মূল্যায়নের সময়স্বল্পতা ও তদারকির অভাব

শিক্ষা বোর্ড সূত্র থেকে জানা যায়, ৬০ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশের বাধ্যতামূলক নিয়ম থাকায় পরীক্ষকদের মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে উত্তরপত্র মূল্যায়নের কাজ শেষ করতে হয়। অভিযোগ উঠেছে, এই কম সময়ে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হয় না। এছাড়াও, নিয়ম অনুযায়ী প্রধান পরীক্ষকের ১২ শতাংশ খাতা পুনরায় দেখার কথা থাকলেও, অনেক সময়ই এই তদারকি প্রক্রিয়াটি যথাযথভাবে সম্পন্ন হয় না বলে অভিযোগ আছে, যা ফলাফলে ত্রুটির জন্ম দিচ্ছে।

বোর্ডভিত্তিক আবেদনের চিত্র

এ বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ১২ লাখ ৩৫ হাজার ৬৬১ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন, যার মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৭ লাখ ২৬ হাজার ৯৬০ জন। বোর্ডভিত্তিক খাতা চ্যালেঞ্জের আবেদনের সংখ্যাও ব্যাপক। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে ৬৬ হাজার ১৫০ জন পরীক্ষার্থী ১ লাখ ৩৬ হাজার ৫০৬টি খাতা চ্যালেঞ্জ করেছেন। বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে ৮ হাজার ১১১ জন পরীক্ষার্থী ১৭ হাজার ৪৮৯টি খাতা; কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে ২২ হাজার ১৫০ জন পরীক্ষার্থী ৪২ হাজার ৪৪টি খাতা; রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে ২০ হাজার ৯২৪ জন পরীক্ষার্থী ৩৬ হাজার ২০৫টি খাতা; যশোর শিক্ষা বোর্ডে ২০ হাজার ৩৯৫ জন পরীক্ষার্থী ৩৬ হাজার ২০৫টি খাতা; চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ২২ হাজার ৫৯৫ জন পরীক্ষার্থী ৪৬ হাজার ১৪৮টি খাতা; সিলেট শিক্ষা বোর্ডে ১৩ হাজার ৪৪ জন পরীক্ষার্থী ২৩ হাজার ৮২০টি খাতা; দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে ১৭ হাজার ৩১৮ জন পরীক্ষার্থী ২৯ হাজার ২৯৭টি খাতা; এবং ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে ১৫ হাজার ৫৯৮ জন পরীক্ষার্থী ৩০ হাজার ৭৩৬টি খাতা চ্যালেঞ্জের আবেদন করেছেন। এছাড়া, বিএম-ভোকেশনালে ১২ হাজার সাত জন পরীক্ষার্থী ১৫ হাজার ৩৭৮টি খাতা এবং আলিমে ৭ হাজার ৯১৬ জন পরীক্ষার্থী ১৪ হাজার ৭৩৩টি খাতা চ্যালেঞ্জের আবেদন করেছেন।

উল্লেখ্য, এ বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল ১৬ অক্টোবর প্রকাশ করা হয় এবং ১৭ অক্টোবর থেকে শুধু অনলাইনের মাধ্যমে ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন গ্রহণ শুরু হয়।

নবীনতর পূর্বতন