গণভোট হবে সংসদ নির্বাচনের দিন।
সোমবার,১৩ অক্টোবর ২০২৫
জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সরকার: জুলাই সনদের গণভোটের সময় নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি রাজনৈতিক দলগুলো
ঢাকা: দীর্ঘ আলোচনার পরেও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় গণভোটের সময় নির্ধারণে রাজনৈতিক দলগুলো চূড়ান্ত ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। কিছু দল যেখানে জাতীয় নির্বাচনের দিনই গণভোট আয়োজনের পক্ষে, সেখানে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ কয়েকটি দল নির্বাচনের আগেই এই ভোট অনুষ্ঠানের দাবিতে অনড়। রাজনৈতিক মহলের এই বিপরীতমুখী অবস্থানের প্রেক্ষাপটে, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গণভোটের সময়সূচি নির্ধারণের চূড়ান্ত ক্ষমতা অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর ছেড়ে দিয়েছে।
আর্থিক সাশ্রয় এবং প্রস্তুতিমূলক বিবেচনায়, অন্তর্বর্তী সরকার আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট একই দিনে আয়োজনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র আভাস দিয়েছে। আগামী শুক্রবার ‘জুলাই সনদ’ স্বাক্ষরের পর সরকারের এই সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
একই দিনে ভোটের যৌক্তিকতা: অর্থ ও সময় সাশ্রয়
সংশ্লিষ্টদের মতে, গণভোট একটি জাতীয় আকারের আয়োজন, যার জন্য ব্যাপক অর্থ এবং সময় প্রয়োজন। জনগণের মধ্যে গণভোটের প্রশ্ন ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে বড় ধরনের প্রচারণাও চালাতে হবে। এই মুহূর্তে সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান মনোযোগ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। নির্বাচনের আগে আরেকটি বড় নির্বাচন আয়োজন করতে গেলে ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনও পিছিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
একাধিক নির্বাচনের কারণে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা এড়ানো এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সরকার ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবিত ক্ষমতাবলে একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন করতে আগ্রহী। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে অনানুষ্ঠানিক 'সবুজ সংকেত' পাওয়া গেছে বলে সূত্র জানিয়েছে। ইসির কর্মকর্তারাও মনে করছেন, আলাদাভাবে দুটি ভোট আয়োজন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে।
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমান মাসউদ গণমাধ্যমকে বলেন, "গণভোটের বিষয়টি রাষ্ট্র ও সরকারের সিদ্ধান্ত। তবে সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে এটি হলে বড় ধরনের ব্যয় সাশ্রয় হবে... এত ব্যয়বহুল কাজ দু'দিনে করা কঠিন হবে। ফেব্রুয়ারিতে দুটি নির্বাচন একসঙ্গে করা সম্ভব এবং সেটাই ভালো হবে।"
ঐকমত্য কমিশন এবং রাজনৈতিক বিভক্তি
বিভিন্ন দল ও পক্ষের ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৈরি 'জুলাই সনদ'-এ সংবিধান ও রাষ্ট্র সংস্কারের একাধিক প্রস্তাবনা রয়েছে। জনগণের সরাসরি মতামত নিশ্চিত করতে এই প্রস্তাবগুলো কার্যকর করার আগে গণভোট আয়োজন করা অপরিহার্য। ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, গণভোটের মূল প্রশ্নটি হবে জুলাই সনদ গ্রহণ বা না করার বিষয়ে, যার উত্তর জনগণ 'হ্যাঁ' বা 'না'-এর মাধ্যমে দেবে।
বিএনপিসহ কয়েকটি দল নির্বাচনের দিন গণভোটের পক্ষে থাকলেও, জামায়াত ও এনসিপি নির্বাচনের আগে গণভোট চায়। বুধবার দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের সর্বশেষ বৈঠকে এ বিষয়ে সমাধান না হওয়ায়, বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে সময় নির্ধারণের ভার সরকারের ওপর দেওয়া হয়।
সূত্র জানায়, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ এবং এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক জাবেদ রাজিন সম্প্রতি কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে নির্বাচনের আগে গণভোটের পক্ষে নিজেদের যুক্তি তুলে ধরেছেন। রাজিন বলেছেন, নির্বাচনের দিন গণভোট হলে 'জুলাই সনদ' গুরুত্ব হারাবে।
সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ
রোম সফর শেষে প্রধান উপদেষ্টা দেশে ফেরার পর বুধ বা বৃহস্পতিবার সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে কমিশনের সুপারিশ জমা দেওয়া হবে। এরপর আগামী শুক্রবার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় 'জুলাই সনদ' স্বাক্ষরিত হবে। এরপরই গণভোটের চূড়ান্ত সময়সূচি নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত পরিষ্কার করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের ভাবনা: চ্যালেঞ্জ ও সহযোগিতা
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের পরিকল্পনা অর্থ ও সময় বাঁচালেও নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের ওপর বিপুল চাপ সৃষ্টি করবে।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. আবদুল আলীম বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই সাধারণ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট হয় এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটারদের তিনটি ব্যালট পেপারে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে একসঙ্গে ভোট হলে ভোটারদের বোঝাতে সমস্যা হবে না।
তবে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ও ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করতে কমিশনকে সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং ভোটারদের বিভ্রান্তি দূর করতে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। তিনি বিশ্বাস করেন, সরকার বৃহত্তর স্বার্থের কথা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে এবং রাজনৈতিক দলগুলোও তা মেনে নেবে।
উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমান সংবিধানে গণভোটের বিধান যুক্ত করলেও, ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার তা বাতিল করে। পরে আদালতের রায়ে আবার গণভোটের সিদ্ধান্ত ফিরে আসে। এখন পর্যন্ত দেশে মোট তিনটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে।
